সোমবার, ১৯ জুন, ২০১৭

দেশের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অবদান



  1. বর্তমান সরকার ২০০৮  সালে যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন বিদ্যুতের অবস্থা রাতের অন্ধকারের মতোই ছিল। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৯৩১ মেগাওয়াট। বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। সরকার প্রায় নতুন ৩৫ লাখ সংযোগ দিতে সক্ষম হয়েছে। ৬৫টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। বেশ কিছু নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প অচিরেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিদ্যুৎ সমস্যা থাববে না আশা করা যায়।
  2. শিক্ষাক্ষেত্রে সফলতা
  3. বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সাফল্য এনেছে। বছরের প্রথম দিনে সকল প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসায় বিনামূল্যে বই বিতরণ সারা বিশ্বে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সরকার দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করেছে। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের ব্যবস্থা করে সরকার হচ্ছে শিক্ষা আইন। ২৪ হাজার স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করে দেয়া হয়েছে। সব শিক্ষাস্তরে তথ্যপ্রযুক্তিকে আলাদা বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা তহবিল গঠন করে স্নাতক পর্যন্ত উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে দেশে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন প্রত্যেক জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
  4. যোগাযোগ খাতে সফলতা
  5. সড়ক যোগাযোগ সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড, বিআরটিসি, বিআরটিএ এবং সেতু বিভাগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তিস্তা সেতু, বরিশালে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সুলতানা কামাল সেতু, শাহ আমানত শাহ সেতু, শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু, বান্দরবানে রুমা ও থানচি সেতু, রংপুরে যমুনেশ্বরী সেতুসহ আরো বেশ কয়েকটি সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
  6. মিরপুর থেকে সেনানিবাসের ওপর দিয়ে বিমানবন্দর সড়কে ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, মগবাজার ফ্লাইওভার ও বনানী রেলক্রসিংয়ের ওভারপাস নির্মাণ এই সরকারের একটি বড় সাফল্য। জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর হয়ে ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মিত হয়েছে। সাভার-নবীনগর মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ, ঢাকা-ময়মনসিংহ, রংপুর বিভাগীয় শহরের সড়ক, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক, নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক এবং নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ উড়ালসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সংযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে। সড়কের ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্ঘটনা হ্রাসে ৬টি ওভারলোড কন্ট্রোল স্টেশন কার্যকর করাসহ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ১১টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে সড়ক বাক প্রশস্তকরণ ও সরলীকরণসহ ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-কক্সবাজার সড়কের আরো ৬টি স্পট সরলীকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কাঁচপুর-আমিন বাজার ব্রিজের নিচে সার্কুলার ডাইভার্সন সড়ক নির্মিত হয়েছে। যা যানজট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
  7. নিজস্ব অর্থয়নে পদ্মা সেতু
  8. দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের আশা আকাক্সক্ষা আর স্বপ্ন পদ্মা সেতু। যা বার বার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পদ্মা সেতু। যার প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা কারো কাছে মাথা নোয়াবার জাতি নয়। আমরা সেই জাতি, যে জাতি সম্পর্কে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না’। অর্থনীতিবিদদের মতে, পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। 
  9. স্বাস্থ্য খাতে সফলতা । স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর মান উন্নয়নেও জোর দিয়েছে সরকার। সংবিধানের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারদের কমপক্ষে দুই বছর নিজ এলাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুহার অনেক হ্রাস পেয়েছে। গড় আয়ু ৭০.৭ বছর হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। ১২৭৭৯ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হাসপাতালের সংখ্যা ১৬৮৩টি থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫০১টি। ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাাপন করা হয়েছে। শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার কারণে এমডিজি পুরস্কার লাভ করে বাংলাদেশ।বিবিধ ,বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তার রাষ্ট্রের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন। যার ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতে আবেদনের মাধ্যমে ভারত ও মায়ানমারের কাছ থেকে প্রাপ্য বিরাট জলরাশির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়েছে। ফলে ব্লু-ইকোনোমিতে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নতুন ৪৭ বর্গ কি.মি. এলাকা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আইসিটি পার্ক গঠন হয়েছে গাজীপুরে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬.৩০ কোটি ছাড়িয়েছে। আইসিটি খাত থেকে অচিরেই ডলার আয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাতীয় তথ্য বাতায়ন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই সরকারের আমলে প্রায় ৭৫ লাখের অধিক বেকার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সংসদের স্পিকার নারী। নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী ভিসি। পুলিশ, সেনাবাহিনী বর্ডার গার্ড নারী সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংক রিজার্ভ ২৯ কোটি বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। যা রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সরকারি ব্যাংকসমূহে চাকরি আবেদন বিনামূল্যে করে দিয়েছে সরকার। এসব উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ ‘সাউথ-সাউথ এওয়ার্ড’ ইত্যাদি পুরস্কার লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিশেষে বলছি, সফলতা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই সরকারের উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের জনগণকে জানাতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে হবে জনসাধারণের কাছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজেদের যোগ্যতার জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আমাদের ছোট্ট এই দেশকে পৃথিবীর বুকে বারবার করেছে সম্মানিত। সরকারের উন্নয়নের এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং হাতে হাত রেখে কাজ করে যেতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগ


  1. বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনীতির মূলধারা আওয়ামী লীগ। এ দলই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর ১০ মাসের মধ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের 'রোজ গার্ডেনে' (প্রাইভেট বাড়ি) অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এর নামকরণ করা হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'।আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার কাহিনী বঙ্গবন্ধু এভাবে বর্ণনা করেন :...পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়_ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল... আমরা জেলে বসে সে খবর পাই...। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিলাম, 'আর মুসলিম লীগের পেছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের... নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোন কর্মপন্থাও নাই।' আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্ররাজনীতি আমি করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে... সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো, 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী [মুসলিম] লীগ।' মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হলো জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে, 'নিরাপত্তা বন্দি'।জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। নামের সঙ্গে 'মুসলিম' শব্দ যুক্ত করাটা ছিল কৌশলমাত্র। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিল সভায় দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য এর দ্বার খুলে দেওয়া হয়। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক।১৯৫৭ সালে বৈদেশিক নীতিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলটি মারাত্মক সাংগঠনিক সংকটের সম্মুখীন হয়। সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী মূলত পাকিস্তানের বৈদেশিক নীতিকে কেন্দ্র করে ভিন্নমত পোষণ করেন। সোহরাওয়ার্দী পাশ্চাত্যের সঙ্গে, বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের পক্ষপাতী হলেও ভাসানী জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পক্ষে মত দেন। পরিণামে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন দল জন্মলাভ করে এবং মওলানা ভাসানী এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।জেনারেল আইয়ুবের স্বৈরাচারী শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের প্রধান দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা হন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর ধানমণ্ডির বাসভবনে কেন্দ্রীয় সদস্যদের সভায় তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন।১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক 'ছয় দফা কর্মসূচি' উপস্থাপন করেন।১৯৬৬ সালের ১৮-১৯ মার্চ ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নিতে সমর্থ হন। তিনি দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে কারাবন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ও অপর ৩৪ জন বাঙালি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নামে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলার বিরুদ্ধে বাঙালিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুরু হয় দেশজুড়ে গণআন্দোলন, পরিণতিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬২টি আঞ্চলিক আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের আহ্বানের পরিবর্তে ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা নির্বাচনের রায় বাতিল ও বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করার জন্য সামরিক বাহিনী তলব করে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন : 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাকিস্তানের উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সব পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রত্যুষে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে।স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর মধ্যে ছিল : ১০ মাসের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২); মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো; নতুন প্রজাতন্ত্রের জন্য বিশ্বের ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ; ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থী এবং যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসরদের দ্বারা সম্ভ্রম হারানো প্রায় তিন লাখ নারীর পুনর্বাসন ইত্যাদি। স্বাধীনতা লাভের ১৫ মাসের মধ্যে নতুন সংবিধান অনুসারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান (৭ মার্চ ১৯৭৩) ছিল আওয়ামী লীগের বড় অর্জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন লাভের মধ্য দিয়ে বিপুল বিজয় অর্জন করে।এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অধস্তন সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যকে হত্যা করে। ৩ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের প্রথমদিকে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে। সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলনের চাপে এরশাদ ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে (৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি এবং ৩০.৮১ শতাংশ ভোট) সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী দলগুলো বেশি ভোট পেলেও (৩৪.২৯ শতাংশ), আসন লাভ করে কম (১০০টি)।১৯৯৬ সালের ১২ জুন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দল নিয়ে গঠিত মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করে। নির্বাচন উপলক্ষে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' নামে পরিচিত তথ্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর একটি সুবিস্তৃত 'দিনবদলের সনদ' বা 'ভিশন-২০২১' কর্মসূচি পেশ করেন। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো হচ্ছে : বিচার বিভাগের চূড়ান্ত রায় অনুসারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ হত্যাকারীর বিচার সম্পন্ন করে ফাঁসির রায় কার্যকর করা; ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা; ধর্মীয় জঙ্গিসহ অন্য জঙ্গিদের কঠোর হস্তে দমন করা; সর্বজন গ্রহণযোগ্য জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন; উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলধারা পুনরুজ্জীবিত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করা ইত্যাদি।১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত ৬৮ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস আওয়ামী লীগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আমাদের জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা দিয়েছে, স্বাধীন দেশের সংবিধান দিয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেনাশাসন থেকে দেশকে উদ্ধার করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালনার নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন; মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার ধারায় দেশ ও জনগণকে ফিরিয়ে এনেছেন; জাতিকে উন্নয়নের ভিশন দেখিয়েছেন; দেশে ও বিদেশে একটি দ্রুত উন্নয়নগামী, ডেমোক্রেটিক, সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।

বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০১৭

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন পঞ্জী (১৯২০-১৯৭৫)



  1. ১৯২০ সাল : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলার তৎকলীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপড়াব প্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম জন্মগ্রহণ করেন। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মাৎ সায়রা বেগমের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মুজিব। বাবা-মা ডাকতেন খোকা বলে। খোকার শৈশবকাল কাটে টুঙ্গীপাড়ায়।
  2. ১৯২৭ সাল : ৭ বছর বয়সে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হন। ৯ বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন।
  3. ১৯৩৪ সাল : ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর একটি চোখ কলকাতায় অপারেশন করা হয় এবং চক্ষু রোগের কারণে তাঁর লেখাপড়ায় সাময়িক বিরতি ঘটে।
  4. ১৯৩৮ সাল : ১৮ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার আনুষ্ঠানিক বিয়ে সম্পন্ন হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের জনক-জননী।
  5. ১৯৩৯ সাল : অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল পরিদর্শন করতে গেলেÑস্কুলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে ছাদ সারাবার জন্য ও ছাত্রাবাসের দাবি স্কুল ছাত্রদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিব তুলে ধরেন।
  6. ১৯৪০ সাল : নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাঁকে গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়।
  7. ১৯৪২ সাল : এন্ট্রান্স (এসএসসি) পাস করেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ইন্টরমিডিয়েটে ভর্তি হন। ধর্মতলা স্ট্রীটের বেকার হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়। বঙ্গবন্ধু এ বছরেই আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
  8. ১৯৪৩ সাল : কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলিগের সম্মেলনে যোগদান করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কলকাতাস্থ ফরিদপুরবাসীদের একটি সংস্থা ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশন-এর সম্পাদক নির্বাচিত হন।
  9. ১৯৪৬ সাল : কলকাতা ইসলামিয় কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন।
  10. ১৯৪৭ সাল : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ঠ্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে কলকাতায় দাঙ্গা প্রতিরোধ তৎপরতায় নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
  11. ১৯৪৮ সাল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে তিনি ভর্তি হন এবং ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ২৩ ফেব্র“য়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নজিমুদ্দিন আইন পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নেবে বলে ঘোষণা দিলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তিনি মুসলিম লীগের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য কর্মতৎপরতা শুরু করেন। ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেও সাথে যোগাযোগ করেন।
  12. ২ মার্চ ভাষা প্রশ্নে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সংগঠিত করার লক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবক্রমে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে সহকর্মীদের সাথে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভরত অবস্থায় গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারে সারা দেশে ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। মুসলিমলিগ সরকার ছাত্রদের আন্দোলনের চাপে গ্রেফতারকৃত ছাত্র নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তিনি ১৫ মার্চ মুক্তি লাভ করেন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্র-জনতার সভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভায় পুলিশ হামলা চালায়। পুলিশী হামলার প্রতিবাদে সভা থেকে ১৭ মার্চ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মঘট পালনের আহ্বাণ জানান। ১৯ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
  13. ১৯৪৯ সাল : ২১ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে এ ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানান। কর্মচারীরা এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযৌতিকভাবে জরিমানা করে। তিনি এ অন্যায় নির্দেশ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহি®কৃত হন। ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইল উপ-নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিরোধী প্রার্থী শামসুল হককে সমর্থন জানান ও তাঁর পক্ষে কাজ করেন। এপ্রিলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে গ্রেফতার হন। ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং জেলে থাকা অবস্থায় এ দলের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন। জেল থেকে বেরিয়েই দেশে বিরাজমান প্রকট খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেন। সেপ্টেম্বরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে গ্রেফতার হন এবং পরে মুক্তি পান। অক্টেবরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় নূরুল আমিনের পদত্যাগ দাবী করেন। এর অব্যবহিত পরে অক্টোবরের শেষ দিকে লিয়াকত আলী খানের কাছে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাসানীর সঙ্গে পুনরায় গ্রেফতার হন।
  14. ১৯৫০ সাল : ১ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আগমন উপলক্ষে আওয়মী মুসলিম লীগ ভুখা মিছিল বের করে। এই মিছিলে নেতৃত্ব দেবার সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এবারে তাঁকে প্রায় দু’বছর জেলে আটক রাখা হয়।
  15. ১৯৫২ সাল : ২৬ জানুয়ারি খাজা নজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু’। এর প্রতিবাসে বন্দী থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্র“য়ারিকে রাজবন্দী মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালন করার জন্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। ১৪ ফেব্র“য়ারি এ দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন। ২১ ফেব্র“য়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর শহীদ হন। জেলখানা থেকে এক বিবৃতিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একটানা ১৭ দিন অনশন অব্যাহত রাখেন। জেলখানা থেকে আন্দোলনকারীদের সংগে যোগাযোগ রাখার দায়ে ঢাকা জেলখানা থেকে ফরিদপুর জেলে তাঁকে সরিয়ে নেয়া হয়। ২৬ ফেব্র“য়ারি ফরিদপুর জেল থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন।
  16. ১৯৫৩ সাল : ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষে মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক ও শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মধ্যে ঐক্যের চেষ্টা হয়। এইলক্ষে ১৪ নভেম্বর দলের বিশেষ কাউন্সিল ডাকা হয় এবং এতে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব গৃহিত হয়
  17. ১৯৫৪ সাল : ১০ মার্চ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্ত ফ্যন্ট লাভ করে ২২৩টি আসন। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জের আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ১৫ মে প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্যন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে দেয়। ৩০ মে করাচী থেকে ঢাকায় ফিরে গ্রেফতার হন। ২৩ ডিসেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন।
  18. ১৯৫৫ সাল : ৫জুন জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ১৭জুন ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে ২১দফা ঘোষণা করা হয়। ২৩জুন আওয়ামী লীগের কার্যকরী পরিষদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা না হলে দলীয় সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করবেন। আগস্টের গণ-পরিষদে তিনি বলেন, আমাদের দাবি এ অঞ্চলের নাম ‘বাংলা’ হবে। বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য দুই-ই রয়েছে। ২১অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিলে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ প্রত্যাহার এবং তাঁেক পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
  19. ১৯৫৬ সাল : ৩ ফেব্র“য়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৪জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনেন শেখ মুজিব। ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর নেতৃত্বে ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করা হয়। চকবাজার একলাকায় পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে ৩জন নিহত হয়। ১৬সেপ্টেম্বর কোয়ালিশন সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুনীর্তি দমন ও ভিলেজ এইড দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।
  20. ১৯৫৭ সাল : সংগঠনকে সুসংগঠিত করবার উদ্দেশ্যে ৩০মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ৭ আগস্ট চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন।
  21. ১৯৫৮ সাল : ৭অক্টোবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দেন। ১১অক্টোবর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একের পর এক মিথ্যা মামলার দায়ে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলাখানায় থাকার পর তাঁকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেটেই গ্রেফতার করা হয়।
  22. ১৯৬১ সাল : ৭ডিসেম্বর হাইকোর্টে রীট আবেদন করে তিনি মুক্তিলাভ করেন। সামরিক শাসন ও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গোপন রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।
  23. ১৯৬২ সাল : ৬ফেব্র“য়ারি তাঁকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়। ২জুন চার বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটলে ১৮জুন মুক্তিলাভ করেন। ২৫জুন জাতীয় নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। ৫জুলাই পল্টনের জনসভায় আইয়ুব সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর লাহোর যান, এখানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় মোর্চা জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হয়। অক্টোবর মাসে গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সারা বাংলা সফর করেন। এ সময়ই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশিষ্ট ছাত্র নেতৃবৃন্দের দ্বারা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
  24. ১৯৬৬ সাল : ৫ ফেব্র“য়ারি লাহরের বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাবিত ৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার গ্রেফতার করা হয়। এ বছর প্রথম তিন মাসে আটবার গ্রেফতার হন। ৮ মে নারায়নগঞ্জে পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তব্য শেষে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। ৭ জুন তাঁর ও আটক নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সময় ডাকা, নারায়নগঞ্জ, টঙ্গীতে পুলিশের গুলিতে শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়।
  25. ১৯৬৮ সাল : ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাঁকে এক নম্বর আসামী করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক করা হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত আসামীদের মুক্তির দাবিতে দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আগতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের বিচার কার্য শুরু হয়।
  26. ১৯৬৯ সাল : ৫ জানুয়ারি ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ সাহেবের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দেলন গণ আন্দোলনে পরিণত হয়। পরে ১৪৪ ধারা ও কার্ফ্যু ভঙ্গ, পুলিশ-ইপিআর-এর গুলিবর্ষণ, বহু হতাহতের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে আইয়ুব সরকার ১ ফেব্র“য়ারি গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান জানায় এবং তাঁকে প্যারোলে মুক্তিদান করা হবে বলে ঘোষণা দেয়। তিনি প্যারোলে মুক্তিদান প্রত্যাখ্যান করেন। ২২ ফেব্র“য়ারি জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে তাঁকেসহ অন্যান্য আসামীকে মুক্তিদানে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্র“য়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্দোগে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার এই সংবর্ধনা সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ভাষণে ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি প্রতি সমর্থন জানান।
  27. ২৬ ফেব্র“য়ারি বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬ দফাসহ ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবী উপস্থাপন করে বলেন ‘গণঅসন্তোষ নিরসনে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই’। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি ও রাজনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুর দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৩ মার্চ তিনি গোলটেবিল বৈঠক ত্যাগ করেন এবং ১৪ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসেন। ২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন। ২৫অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তিন সপ্তাহের সাংগঠনিক সফরে লন্ডন গমন করেন। ৫ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, আমাদের আবাসভুমির নাম পূর্ব পাকিস্তান নয়, হবে বাংলাদেশ।
  28. ১৯৭০ সাল : ৬ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু পূনরায় আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন। ১ এপ্রিল আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের সভায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৭জুন রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। ১৭ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তাঁর দলের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘নৌকা’ প্রতীক পছন্দ করেন এবং ঢাকার ধোলাইখালে প্রথম নির্বাচনী জনসভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। ২৮অক্টোবর তিনি জাতির উদ্দেশে বেতার-টিভি ভাষণে ৬দফা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আবেদন জানান। ১২ নভেম্বরের গোর্কিতে উপকূলীয় এলাকায় ১০লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটলে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারণা বাতিল করে দূর্গত এলাকায় চলে যান এবং আর্ত-মানবতার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ঔদাসীন্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি গোর্কি-উপদ্রুত মানুষের ত্রাণেন জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহবান জানান। ৭ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে।
  29. ১৯৭১ সাল : ৩ জানুয়ারী রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যরা ৬দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং জনগণের প্রতি অনুগত থাকার শপথ গ্রহণ করে। ৫ জানুয়ারী তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বাধিক আসন লাভকারী পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠনে তাঁর সম্মতির কথা ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিষদ সদস্যদের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টারী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২৮ জানুয়ারী জুলফিকার আলি ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। তিনদিন বৈঠকের পর আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৩ ফেব্র“য়ারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহবান করেন। ১৫ ফেব্র“য়ারী ভুট্টো ঢাকার জাতীয় পরিষদের বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান। ১৬ ফেব্র“য়ারী বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে জনাব ভুট্টোর দাবির তীব্র সমালোচনা করে বলেন,‘ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ক্ষমতা একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব বাংলার জনগণ।’
  30. ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দিলে সারা বাংলায় প্রতিবাদেও ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের জরুরি বৈঠকে ২ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহবান করা হয়। ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতাল পালিত হবার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান।
  31. ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু ষোষনা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।” ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙ্গলি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। … প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। শুরু হলো অসহযোগ।
  32. ১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে মুজিব-ইয়হিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্য জনাব ভুট্টো ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো আলোচনা হয়। ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যার্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ঢাকা ত্যাগ। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সোনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা রাইফেলস্ সদর দফতর রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার। বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক যোদ্ধা ছাত্র, কৃষকসহ সর্বস্তরের জনগনের প্রতি আহ্বান জানান।
  33. “স্বাধীনতার ঘোষণা”
  34. ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতর্কিত পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্র“দের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র নামে আপনাদের কাছে আমাদের আবেদন ও আদেশÑদেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপস নাই, জয় আমাদের হবেই, পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্র“কে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এই সংবাদ পৌছিয়ে দিন। আল্লাহ্ আপনাদের মঙ্গল করুন, জয় বাংলা।’
  35. বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান বেতার যন্ত্র মারফত তাৎক্ষনিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় সারাদেশে পাঠানো হয়। রাতেই এই বার্তা পেয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর সেনানিবাসে বাঙালি জওয়ান ও অফিসাররা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার করা হয় গভীর রাতে। পাকিস্তান বাহিনী ১টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং ২৬ মার্চে তাঁকে বন্দী অবস্থায় পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা-পত্রটি পাঠ করেন। সারা বাংলায় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
  36. ১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে (মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। প্রবাসী সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশ লাভ করে স্বধীনতা। তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের লায়ালপুর সামরিক জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার শুরু হয় এবং বিচারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে প্রাণদন্ড প্রদান করা হয়। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানায়। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জনক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি প্রদানের দাবি জানানো হয়। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ও আর্ন্তজাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশের স্থাপতি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
  37. ১৯৭২ সাল : ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই বঙ্গবন্ধু ঢাকার উদ্দেশ্যে লন্ডন যাত্রা করেন। লন্ডনে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লীতে যাত্রা বিরতি করেন। বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারী ঢাকায় পৌঁছেন। তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে লাখো জনতার সমাবেশ থেকে অশ্র“সিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ১১ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ৬ ফেব্র“য়ারী ভারত সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ভারত যান। ২৪ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাঁর আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেন। ১ মার্চ তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে যান। ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ১৯ মার্চ মুজিব-ইন্দিরা ২৫ বছরের ভারত- বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ব্যাংক, বীমা, পাট, বস্ত্র, চিনি ও জাহাজ শিল্পসহ ভারী শিল্প জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত ঘোষনা করেন। ১ মে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ৩০ জুলাই লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর পিত্তকোষে অস্ত্রোপাচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর লন্ডন থেকে তিনি জেনেভা যান। ১০ অক্টোবর বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরী পুরস্কারে ভূষিত করে। ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বচনের তারিখ (৭ মার্চ ১৯৭৩) ঘোষণা করেন। ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের কথা ঘোষণা করেন।
  38. ১৯৭৩ সাল : জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৯৩ আসন লাভ। ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সিপিবি ও ন্যাপের সমন্বয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত। ৬ সেপ্টেম্বর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়া যান। ১৭ অক্টোবর তিনি জাপান সফর করেন।
  39. ১৯৭৪ সাল : ১৯ ফেব্র“য়ারি বঙ্গবন্ধু সরকার ঢাকা পৌরসভাকে কর্পোরেশনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ২২ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি প্রদান। ২৩ ফেব্র“য়ারি ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সর্বসম্মত অনুমোদনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন।
  40. ১৯৭৫ সাল : ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ। ২৪ ফেব্র“য়ারি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন। বঙ্গবন্ধু ২৫ ফেব্র“য়ারি এই জাতীয় দলে যোগদানের জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি আহবান জানান। তিনি বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেন। তাই স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে নতুন ভাবে ঢেলে সাজান। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে মানুষের আহার, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজে সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসুচি ঘোষনা দেন যার লক্ষ ছিল-দুর্নীতি দমন, ক্ষেতে খামারে ও কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত করবার মানসে ৬ জুন বঙ্গবন্ধু জাতীয় দল বাংলাশে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।
  41. সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অভূতপূর্ব সাড়া পান। অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। চোরাকারবার বন্ধ হয়। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় চলে আসে। নতুন আশা-উদ্দিপনা নিয়ে স্বধীনতার সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছিয়ে দেবার জন্য দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে। কিন্তু মানুষের সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না।
  42. ১৫ আগষ্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী অফিসার বিশ্বাসঘাতকের হাতে নিহত হন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী মহিয়ষী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেসা, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুক্তিযোদ্ধা লেঃ শেখ কামাল, পুত্র লেঃ শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্দুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলূল হক মনি ও তার অন্তঃসত্তা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬জন সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনকে ঘাতকরা হত্যা করে।
  43. স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ও জাতি হিসেবে আমাদের ঋন আছে ৩০ লক্ষ শহীদের কাছে। আরো ঋণ আছে তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কিছু মুসলিম দেশের জাতির পিতাদের সংক্ষিপ্ত নামের তালিকা।

কিছু মুসলিম দেশের জাতির পিতাদের সংক্ষিপ্ত নামের তালিকা।
যেমনঃ- পাকিস্থানের জাতির পিতা –
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ , এক সময় জামাতিরা জিন্নাকেই জাতির পিতা মানতেন । পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়াতে জাতির পিতা হলেন
ড. সূকর্ণ সাহেব। ইরানের মত এত বড় ধর্মীয় অনুশাসনের দেশেও জাতির পিতা আছেন,আর তিনি
হলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয়নেতা হযরতআল্লামা আয়াতুল্লাহ খোমেনী (রহঃ)। তিনি হাদিস কোরআনে প্রচুর ধারণা রাখতেন। সেখানে কোন ধর্মীয় বিরোধ নেই জাতিরপিতা মানার ক্ষেত্রে। মুসলিম দেশ তুর্কিস্থান,সেখানে জাতির পিতা আতাতুর্ক কামালপাশা। ফিলিস্তিন, যে দেশ ইহুদি দ্বারা আক্রান্ত, সে দেশের জাতির পিতা হলেন ইয়াসির আরাফাত। সংযুক্ত আরব আমিরাতে শেখ যায়েদ বীন সুলতান নাহিয়্যান ,আফগানিস্তানে মুহাম্মাদ জহীর শাহ্ । ঠিক এভাবেই আরও অনেক মুসলিম দেশেই জাতির পিতা আছে, মানা হয়। অন্যান্য মুসলিম দেশের মতই আমাদের দেশেরজাতির পিতা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুররহমান। এতে কোন ভাবেই ধর্মীয় বিরোধ নেই।

আসুন ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে দেখা যাক,বঙ্গবন্ধুকে বাঙ্গালি জাতির পিতা বললে ক্ষতি আছে কি’ না?
আল্লাহ তা’লা বলেছে-(মিল্লাতা আবীকুম ইব্রা-হীম; হুওয়া ছাম্মা-কুমুল মুছলিমীনা ) অর্থ, ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের জাতি; তিনি তোমাদিগের মুসলমান নাম দিয়েছেন - আল (কুরআন, সুরা আল হজ্ব আয়াত -৭৮)
এখানে উল্লেখ্য যে, দ্বীন দ্বারা ধর্মকে বুঝায়।তাই এখানে ইব্রাহীম(আঃ) এর সাথে পিতা,ধর্ম, এবং মুসলিম । এই তিনটি শব্দ স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যার অর্থ দাঁড়ায় মুসলিম ধর্মের জাতির পিতা। আল্লাহ তা’লা মহাজ্ঞানী; তিনি ভাল ভাবেই জানেন জাতি কোন একক বিষয় নয় তাই তিনি ’মুসলিমীন’ কথা উল্লেখ করে জাতিগত বিভেদ দূর করেছেন । তাই এই নিয়ে বিতর্কের কোন স্থান নেই। আমাদের মধ্যে যদি কেউ বঙ্গবন্ধূকে এই বলে জাতিরপিতা বলতে অস্বীকার করে যে’ইব্রাহীম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নয়।’ সে মূলত না বুঝেই এ কথা বলল। এবং কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা বুঝল না।